হাতে গড়া মেধা

সন্ধ্যে ছয়টার পর কার্ল সাগান ইনস্টিটিউট প্রায় ফাঁকা হয়ে যায় আর আমি বাড়ি ফিরি প্রায় রাত দশটার পর। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় প্রত্যেক প্রফেসরের একটা আলাদা ঘর থাকে মিটিং করার জন্য সেখানে একটা কফি মেশিন রাখা যাতে সবাই যখন খুশি অবাধে কফি খেতে পারে। আমিও দিনে কয়েকবার ওই ঘরে কফি তৈরী করতে যাই। 

প্রতিদিনের মতো কায়ুগা লেকের পার ধরে সন্ধ্যে নেমেছে। এমন একদিন সন্ধ্যের পর কফি আনতে গিয়ে দেখি একজন ছাত্রী আমার বসের মিটিং ঘরে একা একা কোনো একটা বই পড়ছে আর তার আশেপাশে অসংখ্য কাগজপত্র ছাড়ানো। অল্প কিছুক্ষন স্বাভাবিক আলাপচারিতার পর বললো আমার বসের তত্বাবধানে সে একটা প্রোজেক্টে কাজ করা শুরু করেছে। তারপর থেকে আমি যতবারই কফি আনতে ওই ঘরে যাই প্রায় প্রতিবারই দেখি মেয়েটি বসে বসে হোমওয়ার্ক করছে বা কোনো বই পড়ছে।

প্রায় একমাস পর একদিন আমার অফিসে এসে আমি যেসব বিষয় নিয়ে গবেষণা করছি তার উপর কিছু প্রশ্ন করতে থাকলো। তারপর নিজেই বললো সে চীন থেকে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে আন্ডার-গ্রাজুয়েশন পড়বে বলে কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল। দুটো সেমিস্টার পার হওয়ার সময় সর্বসাধারণের জন্য “জ্যোতির্বিদ্যা” -এর উপর একটা কোর্স করতে করতে তার এই বিষয়টা খুব ভালো লেগে যায়। পুরো কোর্সটা করার পর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে সে জ্যোতির্বিদ্যা নিয়ে একদিন উচ্চশিক্ষা করবে। এ কি আর সম্ভব? একজন ইংরেজি বিভাগের ছাত্রী হঠাৎ করে পদার্থবিদ্যার এমন একটা অ্যাডভান্সড বিষয় নিয়ে পড়বে, এটা মামার বাড়ির আবদার নাকি! সে যেহেতু এই বিষয়ে তার সহপাঠীদের থেকে অনেকটা পিছিয়ে তাই সে বেশি রাত করে বসের মিটিং ঘরে নিরিবিলিতে পড়াশুনো করতে পছন্দ করে। 

প্রায় একবছর পার হয়ে গেলো।আমার বসের তত্বাবধানে কাজ শুরু করেছে “রূপান্তরিত মহাকর্ষ” (মডিফায়েড গ্রাভিটি) নিয়ে। ধরা যাক, স্যার আইজ্যাক নিউটনের দেয়া তত্ব না মেনে মহাকর্ষ বল অন্য কোনো তত্ত্ব মেনে চলতো তাহলে মহাবিশ্বের গঠনে কি একই থাকতো নাকি কোনো পরিবর্তন হতো? উল্টোভাবে বলতে গেলে মহাবিশ্বে যেসব গ্যালাক্সি বা ক্লাস্টার পর্যবেক্ষণ করি, তাদের বিন্যাস বিশ্লেষণ করে মহাকর্ষ বলের রূপান্তরিত সূত্র সম্পর্কে আমরা কি কিছু জানতে পারি? এই কাজের উপর সে স্নাতকের চতুর্থ বছরে পদার্থবিজ্ঞানের বনেদি জার্নাল ফিজিক্যাল রিভিউ ডি-তে তার গবেষণাপত্র প্রকাশ করলো।মাসদুয়েক আগে সে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে কসমোলোজিতে পি.এইচ.ডি করার জন্য যোগ দিয়েছে। যার সাথে সম্ভবতঃ কাজ করবে তিনি আমাদের গবেষণা ক্ষেত্রের একজন কিংবদন্তি, যার ওয়েবসাইটের কনটেন্ট থেকে আমরা এখনো অনেক কিছু শেখার চেষ্টা করি।  

বহুজাতিক আর্থিক সংস্থা ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন আর কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা একজন; এজরা কর্নেল। তার নিজের কথায় বলতে গেলে ,”আমি এমন একটা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবো যেখানে যে কেউ যে কোনো বিষয়ে পড়ার জন্য তালিম পাবে”। ভাগ্যিস, এজরা কর্নেল ১৮৬৫ সালে এমন একটা বিশ্ববিদ্যালয় তৈরী করেছিলেন যার জন্য এখনো চীন থেকে আসা এক ছাত্রী ইংরেজি পড়তে পড়তে জ্যোতির্বিজ্ঞানী হয়ে ওঠার সপ্ন দেখতে পারে।

Leave a comment