পেটমোটা লাগেজের রংচটা হাতল টানতে টানতে এসে পৌঁছলাম উর্বশী অপ্সরার মতো নাচতে থাকা জলপ্রপাত দিয়ে ঘেরা এই এলাকায় – ইথাকার অন্দরে। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে এখানে সবাই একত্রিত হয় নতুন কিছু শেখার জন্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের আভিজাত্যের কাছে মাথা নত না করে আমি প্রথম থেকে চেয়েছিলাম “জীবনের খোঁজ” করতে। কথায় বলে খাঁচায় থাকতে থাকতে ডানায় জং ধরে যায়। এই জং ধরা ডানা নিয়ে জীবনকে নতুন করে জানা শুরু হলো নতুন বন্ধুদের সংস্পর্ষে এসে। সেই বন্ধুরা কোনো এক যৌথ কারণে একসাথে রোদে হাঁটে আর রাত্রেবেলা নিজেদের খাঁচায় ফিরে যায় অভ্যাসের দাসত্বে। ইথাকার তুষার ঝড়ের শেষে রোদের আল্পনা তাই বারবার মনে পড়ছে না-ঘুমোনো শহরের দশতলার কামরায় বসে।
আমার মাঝে মাঝে মনে হয় বয়স বাড়লে আমরা যেসব মানুষের সাথে নতুন করে পরিচিত হই তারা শুধু ‘চেনা মানুষ’ হিসেবে জীবনে থেকে যায়, তারা আর বন্ধু হয়ে ওঠে না। বন্ধু আর চেনা মানুষের মাঝে সাদা-কালোর ব্যবধান নয় বরং এক ধূসর আসমানের তফাৎ। তাই বন্ধু হলো প্রতিবাদে, ভারত সরকারের নীতির বিরুদ্ধে সমস্বরে গলা ফাটাতে গিয়ে, বন্ধু হলো বিদেশের মাটিতে বিজয়া দশমী আর নববর্ষ পালন করতে নিয়ে, বন্ধু হলো ওয়াইন গোলা পাস্তার সাথে মাংশের ঝোলে ডোবা আলুর আদর খেতে গিয়ে, বন্ধু হলো পুঁজিবাদ আর সমাজবাদ নিয়ে উত্তাল বিতর্কের পর স্বস্তির অনুযোগে, বন্ধু হলো ব্যর্থ প্রেমে হৃদয়ভাঙার কষ্ট ভুলে সময় কাটাতে, বন্ধু হলো রাত তিনটেয় মাতাল চোখে শেষের কবিতার লাবণ্যের কথায় আর “কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও” কবিতার মোড়কে।
আমার অনেক বন্ধুর মতের সাথে বেশীরভাগ সময়ে আমার মত মেলে না। কিন্তু ঘন্টার পর ঘন্টা বিস্তর বিতর্কের পর আমরা কাশতে কাশতে ‘চিকেন শাওয়ার্মা ওভার রাইস’ ভাগ করে খেয়েছি, কিংবা হাসি ঠাট্টার মাঝে রাগে -অভিমানে একসাথে কায়ুগা লেকের উপর জোৎস্নার ঝলকানি দেখেছি।তেমন একটা পশুপ্রেমী না হয়েও বন্ধু হয়েছি খুব ভোরে মিউ-মিউ করে ঘুম ভাঙিয়ে বিরক্ত করে তোলা প্রাণীর সাথে যে হাজার বার ডাকার পরেও কখনও আমাকে উপেক্ষা করে আবার কখনও খেলতে খেলতে ঘুমিয়ে পড়ে আমার কোলে।
একাকিত্বে জর্জরিত হয়ে আমি আর আমার এক বন্ধু মাঝরাতে হাঁটছি ইথাকা কমনস বরাবর আর আমার বন্ধুটি তার সিগারেটে আগুন জ্বালানোর জন্য লাইটার আনতে ভুলে গেছে। আশেপাশে কারুর কাছ থেকে ধার নিয়ে খানিক সুখ মেটানোর চেষ্টা করছে। টলতে টলতে হেঁটে চলা এক পথচারীর কাছ থেকে লাইটার নেওয়ার পর শুরু হলো গল্পের আসর। সে গল্পগুলোর শুরু আছে কিন্তু শেষ নেই। তারপর একসময় বলে উঠলো,”জীবন হলো একটা কাঁচের গ্লাসের মতো আর অনেকের মতে এই গ্লাসটা অর্ধেক খালি আর অর্ধেক জলে ভরা। কিন্তু আমার মতে গ্লাসটা অর্ধেক খালি না অর্ধেক ভর্তি তা নির্ভর করছে আসলে কে জল পান করছে আর কে গ্লাসে জল ঢালছে তার উপর। যদি সে গ্লাসে জল ঢালতে থাকে তাহলে তার কাছে গ্লাসটি অর্ধেক ভর্তি, আর যদি সে গ্লাস থেকে জল পান করতে থাকে তাহলে তার কাছে গ্লাসটা অর্ধেক খালি।” ক্ষণিক সময়ের বন্ধু অন্যভাবে জীবনের মানে শিখিয়ে দিয়ে গেলো।
জীবন যদি সত্যি একটা খালি গ্লাস হয় তবে সেই গ্লাসে যতক্ষণ এক এক করে বন্ধুরা ভরছে, ততক্ষন জীবন পরিপূর্ণ। জীবনে না-পাওয়ার দুঃখগুলো বরং কাটুক রবি ঠাকুর বা নাজিম হিকমেতের কবিতা আঁকড়ে। তার মধ্যে সেই রোদে হাঁটা বন্ধুরা একদিন ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাবে পৃথিবীর নানান প্রান্তে, হয়তো নিজেরাই রোদ্দূর হবে বলে।
