গুয়াতেমালার রডরিগো

টিকা: লেখাটি “বিজ্ঞান বর্ণালী” ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত লেখাটির স্ক্যান কপিটি এই লিংকে দেখা যাবে।

চোখে ঘুম আধমরা আর তখনই সাহবাসী ফোন বেজে উঠলো সকালের নীরবতা ভেঙে, না জানি কোন শহর থেকে কোন মানবের বার্তা নিয়ে। জানালা বন্ধ কিন্তু ত্রিয়েস্ট শহরের ক্ষণস্থায়ী গ্রীষ্মকালে রোদের ফালিরা চুপিচুপি জানালার ফাঁক দিয়ে আমার ঘরের মেঝেতে জানান দিচ্ছে বিদেশের মাটিতে এক এক বিন্দু সময়ের দাম। হঠাৎ করে ঘুম ভাঙলে আমি আবার সাধারণত চুপচাপ নিজেকে মৃত কল্পনা করার চেষ্টা করি আর আবার ঘুমিয়ে পড়ার চেষ্টা করি। জাগ্রত মস্তিস্ককে আমি আবার বোঝানোর চেষ্টা করি আমি ক্লান্ত তাই আমার আরো কিছুক্ষন ঘুমিয়ে থাকার দরকার। এইরকম সময়ে আমার মাথায় নানান এলোমেলো আধভাঙা শব্দবন্ধ ঘোরাফেরা করতে থাকে। ইতালির নেপোলি শহরে জন্মানো কবি টোরকুয়াটো তাসোর এক অসম্ভব সুন্দর কবিতার দু’পংক্তি অবচেতন মনে বারবার আসছে যা বাংলায় ভাবান্তর করলে দাঁড়ায়, “জীবন, তুমি আমাকে অনুসরণ বা পরিত্যাগ যাই করো না কেন, আমাকে তুমি গ্রাস কারো, আমায় বিলীন করো”।

আমার এক বন্ধু আমাকে ফোন করাতে আমার চেতনা জেগে উঠলো, সুপ্রভাত জানানোর পর সে আমাকে বললো, “আমি আমার পি.এইচ.ডি. এক বছর আগে শেষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি”। আমি অবাক কারণ এমনি ইউরোপ এ পি.এইচ.ডি শেষ করার জন্য খুব কম সময় থাকে। আমেরিকা বা ভারতবর্ষে যেখানে প্রায় পাঁচ  থেকে ছয় বছর গবেষণার জন্য সময় পাওয়া যায় সেখানে আমাদের প্রতিষ্ঠানে প্রায় চার বছর সময় পাওয়া যায়।প্রথম বছরে প্রায় পুরো সময়টা চলে যায় কিছু বিষয়ে লেকচার শুনে আর পরীক্ষায় পাশ করতে গিয়ে। তাছাড়া কেউ যদি উত্তর আমেরিকাতে পোস্টডক (পি.এইচ.ডি পরবর্তী গবেষণা) করতে যায় তাহলে তাকে প্রায় পি.এইচ.ডি শেষ হওয়ার এক বছর আগে থেকে চাকরির জন্য আবেদন করতে হয়। সেভাবে হিসেবে করতে গেলে মাঝে মোটামুটি দু’বছর থাকে নতুন বিষয়ে জানার, গবেষণাপত্র পড়ার, নতুন কোনও বিষয়ে গবেষণা করার, তারপর নিজের গবেষণাপত্র লেখার আর তারপর তা বিভিন্ন রিভিউ পদ্ধতির মধ্যে দিয়ে শেষমেশ কোনো বিখ্যাত জার্নালে প্রকাশ করার। তাই আমার বন্ধু, যার পুরো নাম রডরিগো দে লিওন আর্দন, কেন এক বছর আগে পি.এইচ.ডি শেষ করতে চাইছে তা আমার কিছুতেই বোধগম্য হচ্ছে না।

আমি বিছানা থেকে উঠে হাতে ফোন ধরে পায়চারি করতে থাকলাম আর তাকে জিগেশ করলাম, “আচ্ছা, তা তুমি কবে তোমার থিসিস জমা দেবে আর পি. এইচ. ডি এর শেষ পরীক্ষা (পি.এইচ.ডি ডিফেন্স বলা হয়) দেবে?” সে খুব সাচ্ছন্দের সাথে বললো, “আমি সব কিছু এক মাসের মধ্যে শেষ করতে চাই, তারপর আমি ইটালি থেকে চলে যাবো”। আমি উৎসাহের সাথে জিজ্ঞেস করলাম, “পি.এইচ.ডি. শেষ করার পর কি করবে ভেবেছো নাকি তোমার কাছে এখনই কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পোস্টডক করার অফার আছে?” প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগেই রডরিগো গম্ভীর গলায় বলে উঠলো, “আমি কাঠমিস্ত্রি হবো আর কাঠ দিয়ে নানান রকম আসবাবপত্র বানাবো।” আমার অনেক বন্ধুরা পি.এইচ.ডি.-এর পর নতুন নতুন পেশায় যোগ দিয়েছে, কেউ ব্যাংকে কাজ করতে গিয়েছে, কেউ খুবই ধনী হওয়ার জন্য ফিনান্স ইন্ডাস্ট্রি তে যোগ দিয়েছে, কেউ কলেজে অধ্যাপনায় যোগ দিয়েছে, কিংবা কেউ সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হয়েছে, কিন্তু আমি কখনো কাউকে তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যায় গবেষণা করার পর কাঠমিস্ত্রি হওয়ার কথা বলতে শুনিনি। আমি স্তম্ভিত হয়ে বসে রইলাম কিছুক্ষন। 

আমার বন্ধু রডরিগো ল্যাটিন আমেরিকার গুয়াতেমালা দেশ থেকে ইতালিতে তাত্ত্বিক পাদার্থবিদ্যার এক জটিল বিষয়ের উপর গবেষণা করতে এসেছে। আমরা দুজন একই প্রতিষ্ঠানে একই বছরে গবেষণা করার জন্য যোগ দিয়েছিলাম; রডরিগো তাত্বিক পদার্থবিদ্যার বিষয়ে আর আমি মহাকাশবিজ্ঞান বিষয়ে গবেষণা করা শুরু করেছি। ইতালির আড্রিয়াটিক সাগরের পাশে বিদেশী ছাত্রদের খোলা মনে আলিঙ্গন করার জন্য দাঁড়িয়ে থাকা ত্রিয়েস্ত শহর এমনি অনেক বন্ধুত্বের মাধ্যস্ত হিসেবে কাজ করেছে।

রডরিগো কোনোদিন পদার্থবিদ হওয়ার সপ্ন দেখেনি, সে সপ্ন দেখেছিলো সুরকার আর গায়ক হওয়ার। যখন তার বয়স প্রায় ছয় বছর তখন থেকে সে কিছু কাঠের টুকরো নিয়ে সেগুলো বাজিয়ে কিছু শব্দ তৈরী করার চেষ্টা করতো।কিছু এলোমেলো শব্দ দিয়ে কিভাবে মন ছুঁয়ে ফেলা সুর তৈরী হয় তা নিয়ে রডরিগোর ছোটবেলা থেকে অপরিসীম কৌতূহল ছিল। রডরিগোর বাবার একটা গিটার ছিল যা দেয়ালের এক উঁচু জায়গায় সবসময় ঝোলানো থাকতো আর সে ওই গিটারটা হাতে তুলে নিয়ে বাজাতে চাইতো, কিন্তু তার অনুমতি ছিল না। তাই একদিন সে নিজেই নিজের একটা গিটার বানানোর তৈরী করেছিল কিন্তু তা ছিল আসল গিটার চেয়ে আলাদা। সাত বছর বয়েসে একটা গিটার বানানো কারুর পক্ষে হয়তো সম্ভব নয়। তাই সংগীতের প্রতি রডরিগোর এতো উৎসাহ দেখে তার মা তাকে একদিন একটা খেলনার কীবোর্ড কিনে দিয়েছিলো আর তারপর সে কীবোর্ড বাজানো শিখলো। রডরিগোর সপ্ন হয়ে দাঁড়ালো নিজে মৌলিক সুর সৃষ্টি করবে আর তা পরে রেকর্ড করবে। তাই সে স্কুলে পড়াকালীন সপ্তাহান্তে ভর্তি হলো একটা সংগীতের স্কুলে আর  এইভাবে ধীরে ধীরে সে শিখে ফেললো বেহালা, পিয়ানো, গিটার বাজানো কিন্তু তাও তার মন ভরলো না, কারণ তার চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল তার সুর সৃষ্টি করে রেকর্ড করার। কিন্তু কিভাবে তার নিজের সৃষ্টি করা সুরগুলোকে রেকর্ড করবে তার কোনো ধারণাই তেমন ছিল না। রডরিগোর জীবনে তার ঠাকুরদা খুব বড়ো ভূমিকা পালন করেছে তাই একদিন তিনি রডরিগোকে উপদেশ দিলেন, “সংগীত নিয়ে পড়াশুনো করার চিন্তা করছো সেটা খুব ভালো কথা, কিন্তু জীবনে এমন কিছু ছোটোখাটো জিনিস শিখে রাখো যাতে তোমাকে কখনো না খেতে পেয়ে মরতে হয়।”

সে ভর্তি হলো একটা টেকনিক্যাল স্কুলে যাতে সেখানে থেকে সে ইলেকট্রনিক্স নিয়ে টুকিটাকি বিষয় জানতে পারে। সেই স্কুলে সে প্রথমবার দেখলো গানের সুর কম্পিউটারে দেখতে কেমন দেখায়। সে দেখলো তার সুর কম্পিউটারে অনেকগুলো তরঙ্গের মিশ্রণ হিসেবে দেখাচ্ছে যা আপাত দৃষ্টিতে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। সবচেয়ে মজার জিনিস রডরিগো লক্ষ্য করলো, যখনই সে তার সুর রেকর্ড করছে কোননা কোনোভাবে কিছু “অবাঞ্চিত শব্দ” বা নয়েস এসে যাচ্ছে সুরের সাথে। ওই টেকনিক্যাল স্কুলে একদিন “ফুরিয়ার সিরিজ” বলে পদার্থবিদ্যার এক অন্যতম গুরত্তপূর্ণ বিষয় শিখে গেলো নিজের অজান্তেই আর তারপর আস্তে আস্তে বুঝতে শিখলো রেকর্ড করা তরঙ্গ থেকে কিভাবে শুধুমাত্র সুরের তরঙ্গ ছেঁকে নিতে হয় নয়েসকে কৃত্রিমভাবে লঘু করে। ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রপাতির প্রতি তার এতো আগ্রহ দেখে ওই স্কুলের শিক্ষকেরা তার উপর দায়িত্ব দিলো তাদের অডিটোরিয়ামের সাউন্ড বাক্স, মাইক, এমপ্লিফায়ার, ইত্যাদি দেখাশোনা করার আর যেকোনো অনুষ্ঠানে সেগুলোকে ঠিকঠাক ভাবে ব্যবহার করার জন্য সাহায্য করার। একদিন একটা এমপ্লিফায়ার কিছু গন্ডগোল দেখা দেয়। সে তাড়াতাড়ি তা খুলে ফেলে আর দেখে অনেক রকম সার্কিটের মধ্যে আছে – ট্রানজিস্টর, ক্যাপাসিটর, তারের কুন্ডলি আরো অনেক কিছু যা তার কাছে অজানা ছিল। কিন্তু সেই এমপ্লিফায়ারের বাইরের ঢাকনাটি ছিল ধাতব বস্তু দিয়ে গড়া। কিছু না বুঝতে পেরে সে যখন ওই ধাতব খোলা তাকে এমপ্লিফায়ারের সার্কিটের উপর আবার লাগাতে গেলো, আর সুইচ দেওয়ার পর এমন এক ঘটনা ঘটলো যা রডরিগোর জীবনে খুব গভীর প্রভাব ফেললো এবং পরবর্তী কালে তার শিক্ষাজীবনের অভিমুখ বদলাতে সাহায্য করলো। এমপ্লিফায়ারে “শট সার্কিট” হলো আর বিস্ফোরণের শব্দের সাথে কিছু ট্রান্সিস্টর পুড়ে গেলো আর রডরিগো ওই ছিন্ন ভিন্ন হওয়া এমপ্লিফায়ারের দিকে ভীত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো।

মনে প্রচন্ড ভয় নিয়ে রডরিগো যখন তার শিক্ষককে এমপ্লিফায়ারের কথা জানালো তার শিক্ষক হেসে বললো, “তুমি যখন এমপ্লিফায়ারের এমন হাল করছে তাহলে তুমি ঠিক করো এটাকে কিভাবে আবার ঠিক করবে।” ধীরে ধীরে নিজে থেকে টুকটাক চেষ্টা করতে করতে প্রায় দুই বছর পর রডরিগো আবার ওই এমপ্লিফায়ার থেকে সরিয়ে তুলেছিল। এইভাবে সে বিক্ষিপ্ত ভাবে পদার্থবিদ্যার কিছু বিষয়ের সম্পর্কে ধারণা তৈরী করেছিল। সে ভালো করে বুঝতে পারলো সব কিছু রেকর্ড করতে গেলে তাকে সবার আগে পদার্থবিদ্যার অনেক বিষয় খুঁটিনাটি জানতে হবে। তাই সে গুয়াতেমালার এক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো পদার্থবিদ্যা নিয়ে স্নাতক হওয়ার জন্য। পদার্থবিদ্যা পড়ার সময় তাকে “কোয়ান্টাম বলবিদ্যা” সবচেয়ে বেশি কৌতূহলী করে তুললো. রডরিগো সংগীত সৃষ্টি করার পাশাপাশি নতুনভাবে জগৎকে জানতে আর বুঝতে চেষ্টা করলো। কিন্তু স্নাতক-স্তরে পদার্থবিদ্যা নিয়ে পড়তে আসার মূল কারণ ছিল যাতে সে খুব ভালো করে তার সৃষ্টি করা সুরগুলোকে রেকর্ড করতে পারে। 

ধ্রুবতারা যেমন মাঝ সমুদ্রে হারিয়ে যাওয়া জাহাজের নাবিকদের দিক নির্ণয় করতে সাহায্য করে আমার মনে হয় আমাদের জীবনে কিছু মানুষের অনুপ্রেরণা ওই ধ্রুবতারার মতো আমাদের জীবনে দিশা দেখতে সাহায্য  করে। রডরিগো জানতে পারলো গুয়াতেমালা থেকে একজন পদার্থবিজ্ঞানী কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। বিজ্ঞানী ফার্নান্দো কুয়েভেদো এমনি একজন মানুষ যিনি শুধু রডরিগোকেই নয় বরং উন্নতশীল দেশগুলো থেকে আসা ছাত্রদের পরিণত বিজ্ঞানী গড়ে তুলতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। রডরিগো যখন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাশ করবে তখন প্রফেসর ফার্নান্দো কুয়েভেদো ত্রিয়েস্তে শহরের “ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর থিওরিটিক্যাল ফিজিক্স” বা এই.সি.টি.পি-এর অধিকর্তা হিসেবে কাজ করছেন। তাই রডরিগো ঠিক করলো ত্রিয়েস্তেতে গিয়ে পদার্থবিদ্যা নিয়ে উচ্ছশিক্ষা গ্রহণ করবে আর স্নাতক হওয়ার পর তার সুযোগ হলো ত্রিয়েস্তের বিখ্যাত এই.সি.টি.পিতে পদার্থবিজ্ঞানে ডিপ্লোমা করার।

ত্রিয়েস্তের শিক্ষার পরিবেশ খুবই অনুরূপ কিন্তু সেই পরিবেশ একজন টেকনিকাল ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসা ছাত্রের পক্ষে খুব কঠিন হয়ে পড়লো। সে তার আশেপাশে দেখলো কলোম্বিয়া, কোরিয়া, ইতালি, আর অন্যান্য দেশের সবচেয়ে মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের যারা তার সাথে একই শ্রেণীতে পড়াশুনো করছে। হতাশ হতে শুরু করলো যখন সে খেয়াল করলো লেকচারের অনেককিছুই সে ঠিকঠাক বুঝতে পারছে না। তার কাছে তখন খুব সাধারণ দুটো পথ পড়ে রইলো, হয় সে সব ছেড়ে চলে যাবে তার দেশে আর নতুন করে কিছু করার চেষ্টা করবে, নয়তো সে নিজের সাধ্যমতো কঠোর পরিশ্রম করে মনপ্রাণ দিয়ে এক বছর লড়াই করে দেখবে ফল কি হয়। রোডরিগো শেষ পথটি বেছে নিলো। সারাদিন পড়াশুনো করে রাত এগারোটার সময় শেষ বাস ধরে বাড়িতে ফিরত আর এভাবেই সে শিখে গেলো পদার্থবিজ্ঞানের অনেক জটিল বিষয়ে – সহজে নয় সংগ্রাম করতে করতে।

রডরিগো গবেষণা করতে শুরু করলো স্থান-কালের “কোয়ান্টাম” সত্তার বিষয়ে। যদি একটা আমরা একটা তবলা বজাই তাহলে আমরা বুঝতে কিভাবে বুঝতে পারবো ওই তবলাটি কোন কম্পাঙ্কে বাজছে? এটা বোঝার জন্য আমাদের ক্লাসিকাল পদার্থবিজ্ঞান জানলে চলবে আর তা ব্যবহার করে আমরা কোন কোন কম্পাঙ্কে তবলার চামড়াটি স্পন্দিত হচ্ছে তা নির্ণয় করতে পারবো। এখানে তবলার চামড়ার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এটা একটা নিরবিচ্ছিন্ন পর্দা যার মধ্যে কোনো বিচ্যূতি বা ফাটল নেই। কিন্তু এখন যদি আমরা তবলার চামড়ার “কোয়ান্টাম” সাত্তার দিকে লক্ষ্য করি তাহলে তবলার চামড়ার মধ্যে অসংখ্য ছিদ্র আছে কারণ সেটি অনেক অনু-পরমাণু দিয়ে গড়া আর সেই সব পরমাণুর মধ্যে মাইক্রোস্কোপিক স্কেলে অনেক দূরত্বের ব্যবধান রয়েছে। তেমনি স্থান-কাল যদি তবলার চামড়ার মতো নিরবিচ্ছিন্ন না হয়ে যদি কয়েকটি বিচ্ছিন্ন কণার সমষ্টি হয় তাহলে সেই “কোয়ান্টাম” জগৎ-এ কোনো স্পন্দনের ধর্ম কেমন হবে বা তা কিভাবে গাণিতিকভাবে প্রকাশ করা যাবে, ইত্যাদি খুব জটিল বিষয়ে রডরিগো গবেষণা করেছে। কিন্তু এর মধ্যে রডরিগোর জীবনে অনেক কিছু ঘটে গেছে, তার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ তার ঠাকুরদা পরলোক গমন করেছেন। রডরিগো ওই সময়ে ইতালি থেকে গুয়াতেমালা আস্তে পারেনি কারণ তার কাছে যাতায়াতের জন্য পর্যাপ্ত টাকা ছিল না।ওই সময় সে একাকিত্ব কে আগলে ধরে গবেষণার কাজ করে গেছে।

রডরিগোর পরিবার এখন রাজধানী গুয়াতেমালা সিটিতে থাকে কিন্তু সে থাকে দেশের উত্তরে হুয়েহুয়েটেনাঙ্গতে তার পোষ্য কুকুরের সাথে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে, আমি হঠাৎ করে গুয়াতেমালা ঘুরতে যাই, তখন আমার বন্ধুর সাথে আবার যোগাযোগ করি। সে আমাকে গাড়ি করে ঘোরাতে থাকে আর নিয়ে যায় লেক অতিতলানে।আমরা নৌকায় এক দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপে যাচ্ছি আর পদার্থবিদ্যা নিয়ে কথা বলছি। আমরা দুজনে অনেক কিছু আলোচনার পর একে অপরকে জিজ্ঞেস করলাম, “আচ্ছা কোন একটা আবিষ্কার বা কোনও তথ্যের প্রমান আমরা আমাদের জীবদ্বশায় যেতে চাই?.” আমি বলেছিলাম আমার জীবদ্বশায় আমি আমরা এই মহাবিশ্বে একা কিনা এই প্রশ্নের উত্তর পেতে চাই. আর রডরিগো নৌকার গতিতে সামনে উপচে পড়া জলের ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে বলেছিলো, “কোয়ান্টাম গ্রাভিটি কি করে কাজ করে আর তা কোনো পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করা” তার জীবদ্বশায় দেখে যেতে চায়। না, ঐদিন সে পি.এইচ.ডি.-এর পর কাঠমিস্ত্রি হওয়ার কথা মিথ্যে বলে নি। সে সত্যিই এক বছর ধরে কাঠমিস্ত্রি হয়ে কাজ করছিলো। পড়াশুনো করেছে জাপানী কাঠের আসবাবপত্র বানানোর পদ্ধতির উপর আর শিখেছে কিভাবে দুটো কাঠের টুকরোকে নির্দিষ্টভাবে আঠা না লাগিয়ে জোড়া লাগানো যায়। আমাকে দেখালো সে নিজের হাতে যা যা বানিয়েছে, চেয়ার, টেবিল, ডেস্ক, আরো অনেককিছু। আমাকে বললো সে এই সব বানিয়ে জীবনকে তেমন ভাবেই অনুভব করেছে যেমন ভাবে পদার্থবিদ্যার কোনো জটিল সমস্যার সমাধান করে হয়। 

আমরা সাধারণত খুব মহান মানুষদের জীবনে অনুসরণ করে তাদের পথে চলতে চাই। আইনস্টাইন থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আর আমরা তাদের মতন হতে চাই, কিন্তু আমরা ভুলে যাই তারা সবার থেকে অনেকটাই আলাদা, নাহলে অনেকে বিগত একশো বছরে শুধুমাত্র তাদের অনুকরণ করে তাদের মতো মহান হতে পারতো। আমরা মনে হয় আমাদের অনেক সময় এমন লোকেদের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়া উচিত যারা প্রায় আমাদেরই মতো, আমাদের মতো সমাজ থেকে উঠে এসেছে, যারা আমাদের মতো দারিদ্রতা সম্মুখীন হয়েছে, আর কম সুযোগ সুবিধার মধ্যে বড়ো হয়েও ধীরে ধীরে নতুন কিছুর করা সপ্ন দেখছে। 

আমরা কেউ সফল হলে জানতে পারি তাদের বেড়ে ওঠা বা সংগ্রামের গল্প।কতজন মানুষ এই সংগ্রামের করতে করতেও শেষ পর্যন্ত সফলতার দরজা খুলে দেখতে পারে না আর হারিয়ে যায় আমাদের জ্ঞানের দিগন্তের বাইরে- তার হিসেবে আমরা কখনো রাখিনা। তাই আমার বন্ধু যে সুরকার হতে গিয়েও পদার্থবিদ্যায় গবেষণা করে ফেললো, তার গল্প আমাকেও অনুপ্রেরণা জোগায়।

গুয়াতেমালার লেক আতীতলানের মাঝে এক দ্বীপ থেকে তোলা দুটো ছবি।

Leave a comment